Monday, April 4, 2011

ইন্দ্রলাল রায়: প্রথম বাঙালি ফাইটার পাইলট ও প্রথম মহাযুদ্ধের বিস্মৃতপ্রায় এক বীরসেনানী






দিনটি ছিল ১৯ জুলাই ১৯১৮। প্রথম মহাযুদ্ধ চলছে। ফ্রান্সের আকাশে জার্মান বিমানবাহিনী ও ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানবাহিনী তুমুল আকাশযুদ্ধে লিপ্ত। ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানবাহিনীর ১৯ বছর বয়সী এক তরুণ ফাইটার পাইলট সেদিন ডগফাইটের সময় একটি জার্মান জঙ্গীবিমান গুলি করে ভূপাতিত করলেন। এটি ছিল তাঁর দশম শত্রুবিমান শিকার–যে কৃতিত্বের জন্য তিনি পেয়েছিলেন ‘ফ্লাইং এইস’ (Flying Ace) খেতাব।
এই খেতাব পাওয়ার জন্য যেখানে সাধারণত পাঁচটি শত্রুবিমান ঘায়েল করাই যথেষ্ট, সেখানে তিনি খতম করেছিলেন দশটি! আকাশযুদ্ধের সেই প্রথম যুগে, সদ্যযুবক এক ফাইটার পাইলটের মাত্র তের দিনের, ১৭০ উড়াল-ঘন্টার এক অতি-সংক্ষিপ্ত লড়াই-জীবনের পক্ষে এটি ছিল এক অসামান্য বীরত্বপূর্ণ কৃতিত্ব–যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। এই অকুতোভয় বীরসেনানীর নাম ইন্দ্রলাল রায়–প্রথম বাঙালি ফাইটার পাইলট এবং প্রথম বাঙালি বা ভারতীয় ‘ফ্লাইং এইস’।
বরিশালের এক জমিদার পরিবারের সন্তান ইন্দ্রলাল রায় ১৮৯৮ সালের ২ ডিসেম্বর তারিখে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ব্যারিস্টার পি. এল. রায় ও মাতার নাম ললিতা রায়। পড়াশোনার জন্য দশ বছর বয়সে তাঁকে লন্ডনে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি পড়াশুনার পাশাপাশি খেলাধুলায়ও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। এরপর তিনি অক্সফোর্ডে পড়ার জন্য বৃত্তিলাভ করেন।
কিন্তু অক্সফোর্ডে পড়তে না গিয়ে তিনি বিমানচালনার নেশায় ১৯১৭ সালের এপ্রিল মাসে ১৮ বছর বয়সে ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানবাহিনী (Royal Flying Corps)-তে  অফিসার ফ্লাইং ক্যাডেট হিসেবে নাম লেখান। একই বছরের ৫ জুলাই তারিখে তিনি সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করেন। পেশাগত প্রশিক্ষণশেষে তিনি ৩০ অক্টোবর ১৯১৭ তারিখে ফ্রান্সে যুদ্ধরত রাজকীয় ৫৬ স্কোয়াড্রনে যোগ দেন।
এর কিছুদিন পরই, ৬ নভেম্বর ১৯১৭ তারিখে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে তিনি গুরুতর আহত হন। কথিত আছে, হাসপাতালে নেওয়ার পর প্রথমে তাঁকে ‘মৃত’ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তিনি বেঁচে ওঠেন। তবে তাঁকে শারীরিক কারণে ‘গ্রাউন্ডেড’ করা হয়। তারপর তিনি অনেক সাধ্য-সাধনা করে, পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া সত্ত্বেও, আবার সক্রিয় যুদ্ধে ফিরে যান এবং তাঁকে লেফটেন্যান্ট পদে পদোন্নতি প্রদান করা হয়। ১৯১৮ সালের  ১৯ জুন তারিখে তাঁকে ফ্রান্সে যুদ্ধরত রাজকীয় ৪০ স্কোয়াড্রনে বদলি করা হয়।
আকাশযুদ্ধে তাঁর প্রথম সাফল্য আসে ৬ জুলাই ১৯১৮ তারিখে একটি জার্মান জঙ্গীবিমান ধ্বংস করার মাধ্যমে। এরপর তিনি ৮ জুলাই তারিখে চার ঘন্টায় তিনটি; ১৩ জুলাই দুইটি; ১৫ জুলাই দুইটি; এবং ১৮ জুলাই তারিখে একটি শত্রুবিমান ধ্বংস করেন। তাঁর সবশেষ সাফল্য আসে ১৯ জুলাই তারিখে, যার কথা লেখার প্রথমেই বলেছি। ৬ থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত মাত্র তের দিনে দশটি শত্রুবিমান ঘায়েল করে তিনি ঠাঁই পেয়ে যান ইতিহাসের পাতায়।
এর তিন দিন পর, ২২ জুলাই ১৯১৮ তারিখে ফ্রান্সের আকাশে জার্মান বিমানবাহিনীর সাথে এক সম্মুখ যুদ্ধে তাঁর এসই-৫এ বিমানটি ফ্রান্সের জার্মান অধিকৃত এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। জার্মান সেনারা তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করে সেখানেই সমাহিত করে। কথিত আছে, তাঁর অসাধারণ বীরত্বের কথা মনে রেখে সেই জার্মান শত্রুসেনারাও তিনি যেখানে পতিত হয়েছিলেন, সেখানে ফুলের তোড়া রেখে আসে। ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানবাহিনী তাঁর অসামান্য কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে মরণোত্তর, অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ‘ডিস্টিংগুইশড ফ্লাইং ক্রস’ (DFC) পদকে ভূষিত করে।
ভারত সরকার ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে ইন্দ্রলাল রায়ের জন্মশতবার্ষিকীতে স্মারক ডাকটিকেট প্রকাশ করে। এছাড়া ফ্রান্সে তাঁর সমাধির ওপর বাংলা ও ফরাসি ভাষায় গৌরবগাঁথা লেখা হয়। তাঁর নামে কলকাতায় একটি সড়কও রয়েছে। এই বাঙালি বীরের পরিবারের আরেক সন্তান, এয়ার মার্শাল সুব্রত মুখার্জিও ছিলেন একজন ফাইটার পাইলট ও স্বাধীন ভারতের প্রথম বিমানবাহিনী প্রধান।
আমরা কয়জন জানি এই বাঙালি বীরসন্তানের নাম?
তথ্যসূত্র:
১। এশিয়ান্‌স ইন ব্রিটেন: ফোর হান্ড্রেড ইয়ার্‌স অব হিস্ট্রি, রোজিনা ভিস্রাম, ২০০২।
২। উইকিপিডিয়া।
৩। হাবপেজেস ও অন্যান্য।
প্রকাশিত লিংক:
১। সোনার বাংলাদেশ ব্লগ।
২। মুক্তব্লগ।
৩। নাগরিক ব্লগ।
৪। চতুর্মাত্রিক ব্লগ।
৫। শব্দনীড়।
৬। আমার ব্লগ।
৭। আমার বর্ণমালা ব্লগ।
৮। বিডিনিউজ২৪ ব্লগ।

নূর ইনায়েত খান: ‘রাজকন্যা’ থেকে গুপ্তচর হওয়া এক অসমসাহসী নারীর কথা


১২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৪। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়। জার্মানির দাচাউ বন্দীশিবির। সেদিন তখনও ভোরের আলো ভাল করে ফোটেনি। হত্যা করার জন্য ফায়ারিং স্কোয়াডে নিয়ে যাওয়া হয়েছে শিকলবন্দী চার নারীকে। ঘাতকের গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল একে একে তিনজন। এবার চতুর্থজনের পালা। একজন ঘাতক প্রথমে বন্দুকের বাঁট দিয়ে আঘাত করল তাঁকে। আহত বন্দিনী মাটিতে লুটিয়ে পড়লে ঘাতক তার শক্ত মিলিটারি বুটের ক্রমাগত লাথি দিয়ে তাঁকে রক্তাক্ত করে ফেলল। তারপর মুমূর্ষ অবস্থায়ই তাঁকে জোর করে হাঁটু গেড়ে বসানো হল। আর কয়েক মুহূর্ত পরেই নিশ্চিত মৃত্যু। তবুও সেই নারী ভেঙ্গে পড়েননি কিংবা মৃত্যুভয়ে কাতর হননি মোটেও। বরং ঘাতক যখন গুলি করার জন্য রাইফেল তাক করেছে তাঁর মাথা বরাবর, ‘স্বাধীনতা’ বলে তিনি জীবনের অন্তিম শব্দটি উচ্চারণ করলেন দ্রোহে, দৃঢ়তায়। এভাবেই মাত্র তিরিশ বছর বয়সে মৃত্যুকে বরণ করে নিলেন সেই অকুতোভয় নারী। তিনি নূর ইনায়েত খান–শান্ত, লাজুক ‘রাজকন্যা’ থেকে দুঃসাহসী গুপ্তচরে পরিণত হওয়া এক অসামান্যা ভারতীয় নারী।
তিনি জন্মেছিলেন মহীশুরের কিংবদন্তীতুল্য শাসক টিপু সুলতানের রাজবংশে। তাই জন্মগতভাবে তিনি ছিলেন একজন ‘প্রিন্সেস’। তাঁর পিতা ছিলেন টিপু সুলতানের প্র-প্রপৌত্র প্রিন্স ইনায়েত খান–একজন সুফিসাধক ও সঙ্গীতজ্ঞ। তাঁর মাতা ছিলেন একজন আমেরিকান, অরা মীনা রে বেকার ওরফে আমিনা বেগম। নূর-উন-নিসা ইনায়েত খানের জন্ম হয় রাশিয়ার মস্কোতে, ১৯১৪ সালের ১ জানুয়ারি তারিখে। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়।
নূরের জন্মের পর পরই তাঁর পরিবার রাশিয়া থেকে ইংল্যান্ডে চলে যায় এবং লন্ডন শহরে বসবাস শুরু করে। এ সময় ছোট্ট নূরকে কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়। কিন্তু স্বদেশের স্বাধীনতাকামী প্রিন্স ইনায়েত খান একজন কট্টর জাতীয়তাবাদী ও মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের একনিষ্ঠ সমর্থক হওয়ার কারণে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে সন্দেহের চোখে দেখত। ফলে বাধ্য হয়ে তিনি তাঁর পরিবার নিয়ে ১৯২০ সালে ফ্রান্সে চলে যান এবং প্যারিসের উপকণ্ঠে ‘ফজল মঞ্জিল’ নামক একটি বাড়িতে ওঠেন।
ইউরোপে জন্ম এবং বসবাস হলেও নূর বেড়ে ওঠেন তাঁর পিতার অহিংস সুফি আদর্শ, ভারতীয় সংস্কৃতি ও রক্ষণশীল পারিবারিক আবহকে ধারণ করে। ছোটবেলা থেকেই তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীতে তালিম নেন। তিনি প্যারিসের একটি কনজার্ভেটরীতে সঙ্গীত এবং সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিশু মনস্তত্ত্বে শিক্ষালাভ করেন। ছোটবেলা থেকেই নূর ছিলেন শান্ত, লাজুক, স্বাপ্নিক ও ভাবুক প্রকৃতির।
১৯২৭ সালে নূরের পিতার আকস্মিক মৃত্যু হলে তাঁর মাতা আমিনা বেগম স্বামীশোকে পুরোপুরি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। ফলে গোটা পরিবারের দায়িত্ব বর্তায় নূরের ওপর। এসময় তিনি প্যারিসে বিভিন্ন শিশু সাময়িকীতে লেখালেখি এবং রেডিওতে শিশুদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতেন। পরে তাঁর লেখা একটি শিশুতোষ বইও প্রকাশিত হয়।
এরই মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। আগ্রাসনকারী জার্মান বাহিনী ফ্রান্স দখল করে নিলে নূরের পরিবার প্যারিসে থাকা আর নিরাপদ মনে করল না। ফ্রান্স থেকে পালিয়ে ১৯৪০ সালের জুন মাসে আবার তারা ইংল্যান্ডে ফিরে আসে। কিন্তু ইংল্যান্ডের আকাশেও তখন যুদ্ধের ঘনঘটা। জার্মান বাহিনীর নির্বিচার আগ্রাসন এবং যুদ্ধের ভয়াবহতা ও নৃশংসতা দেখে নূর ও তারঁ ভাই বিলায়েত খান নিস্পৃহ না থেকে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন–যদিও তা ছিল তাঁদের প্রয়াত পিতার অহিংস সুফি আদর্শের পরিপন্থী।
১৯৪০ সালের ১৯ নভেম্বর নূর ব্রিটিশ উইমেন্স অক্সিলিয়ারি এয়ার ফোর্স (WAAF)-এ যোগ দেন এবং রেডিও অপারেটর হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণ শেষে তাঁকে রাজকীয় বিমানবাহিনীর বম্বার ট্রেনিং স্কুলে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানকার কাজ তাঁর কাছে একঘেয়ে লাগায় তিনি কমিশন্ড পদবির জন্য আবেদন করেন। ফরাসি ভাষার ওপর তাঁর দক্ষতার কারণে পরবর্তীতে তাঁকে চার্চিলের বিশেষ গুপ্তচর সংস্থা, স্পেশাল অপারেশন্স এক্সিকিউটিভ (SOE)-এর এফ (ফ্রান্স) সেকশনে ভর্তি করা হয়।
এরপর গুপ্তচর হওয়ার জন্য নূরকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়। প্রশিক্ষণের সময় তিনি নোরা বেকার নাম নেন। কিন্তু এসব প্রশিক্ষণে তাঁর ফলাফল তেমন সন্তোষজনক ছিল না, বরং গুপ্তচর হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ ফিল্ড এসাইনমেন্টের জন্য তাঁর যোগ্যতা নিয়ে প্রশিক্ষকদের দ্বিধা ছিল। বিশেষ করে তিনি আগ্নেয়াস্ত্র চালাতে ভয় পেতেন। এমনকি, প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে একটি ‘মক ইন্টারোগেশন’ বা সাজানো জেরার সময় তিনি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন এবং কান্নায় ভেংগে পড়েন! তিনি গুপ্তচর প্রশিক্ষণ পুরোপুরি শেষ করতে পারেননি।
তবে ফরাসি ভাষা ভাল জানার কারণে এবং রেডিও অপারেটর হিসেবে দক্ষতার জন্য কর্তৃপক্ষ তাঁকে গুপ্তচর হিসেবে প্যারিসে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। প্যারিসে পাঠানোর আগে কর্তৃপক্ষ নূরকে জানায়, কাজটি অত্যন্ত বিপদজনক এবং শত্রুর হাতে ধরা পড়লে নিশ্চিত মৃত্যু। এসব জেনেও তিনি প্যারিসে গুপ্তচর হিসেবে যেতে রাজি হন। তিনি হলেন শত্রু-অধিকৃত ফ্রান্সে গমনকারী প্রথম ব্রিটিশ নারী গুপ্তচর।
অবশেষে ১৯৪৩ সালের ১৬ জুন তারিখ রাতে নূর তাঁর সাংকেতিক নাম ‘মেডেলিন’, অপারেটর কলসাইন ‘নার্স’ এবং ভুয়া পাসপোর্টে ‘জীন মারি রেগ্নিয়ার’ ছদ্ম পরিচয় নিয়ে ফ্রান্সের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। নূরের এই গোপন মিশন সম্পর্কে তাঁর পরিবারও জানত না। ব্রিটিশ রাজকীয় বাহিনীর একটি বিমান তাঁকে উত্তর ফ্রান্সের একটি অবতরণ-স্থানে রাতের অন্ধকারে, গোপনে নামিয়ে দেয়।
প্যারিসে এসে নূর ‘প্রসপার নেটওয়ার্ক’ নামক ব্রিটিশ গুপ্তচর দলে যোগ দেন–যারা জার্মানদের বিরুদ্ধে ফরাসি প্রতিরোধ-সংগ্রামের পক্ষে কাজ করত। কিন্তু ততদিনে জার্মান গোয়েন্দারা প্রসপার নেটওয়ার্কের খোঁজ পেয়ে গেছে। পরবর্তী দেড়মাসের মধ্যে নূর ছাড়া এই দলের দলনেতাসহ প্রায় সবাই জার্মান গেস্টাপো বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে এবং এর ফলে প্যারিসে ব্রিটিশ গোয়েন্দা কার্যক্রম সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। অবস্থা বেগতিক দেখে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ নূরকে ইংল্যান্ডে ফিরে যেতে বলে। কিন্তু তিনি ছাড়া প্যারিসে আর কোন যোগাযোগের মাধ্যম না থাকায় চরম বিপদাপন্ন জেনেও নূর ফিরে যেতে রাজি হননি।
জার্মান-অধিকৃত এলাকায় যেখানে একজন গুপ্তচর রেডিও অপারেটরের গড় ‘আয়ুষ্কাল’ ছিল মাত্র ছয় সপ্তাহ, ফিল্ড অপারেশনের জন্য ‘আনফিট’ নূর একাই সেখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গুপ্তচরবৃত্তির প্রায় অসম্ভব কাজে নেমে পড়লেন। এর মধ্যে জার্মানরা তাঁর দৈহিক বর্ণনা ও গোপন নাম জেনে ফেলল এবং তাঁকে ধরার জন্য গোটা প্যারিসজুড়ে সর্বশক্তি নিয়োগ করল।
ধরা না পড়ার জন্য নূর প্যারিসে একের পর এক অবস্থান পাল্টাতে লাগলেন। তিনি বারবার নিজের নাম, বেশভূষা, চুলের রঙ ও স্টাইল পরিবর্তন করে জার্মানদের ধোঁকা দিয়ে তাঁর কাজ চালিয়ে যেতে থাকলেন। ফরাসি ভাষা খুব ভালভাবে রপ্ত থাকায় তিনি নিজেকে ফরাসি নাগরিক প্রমাণ করে জার্মান চেকপোস্ট অতিক্রম করাসহ বিভিন্ন বিপদজনক পরিস্থিতি মোকাবেলা করতেন। একসময়ের ভিতু নূর তখন দুঃসাহসী মেডেলিন।
নূর সবসময় ১৫ কেজি ওজনের গুরুত্বপূর্ণ রেডিও সেটটি সঙ্গে বহন করতেন। একদিন তিনি প্রায় ধরা পড়তে যাচ্ছিলেন। জার্মান গেস্টাপো তাঁকে তাঁর রেডিও সেটসহ চ্যালেঞ্জ করলে তিনি এটিকে সিনেমা প্রোজেক্টর হিসেবে চালিয়ে দিয়ে পার পেয়ে যান। এভাবে দূঃসাহস আর বুদ্ধির জোরে ধরা পড়ার চরম বিপদ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখে এবং তাঁর সম্পর্কে প্রশিক্ষকদের মূল্যায়ন ভুল প্রমাণ করে তিনি একাই ছয়জন রেডিও অপারেটরের দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করে যাচ্ছিলেন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভাগ্য তাঁর সহায় থাকেনি। তবে নিজের কোন ভুলে নয়, বরং এক পরিচিতজনের অপ্রত্যাশিত বিশ্বাসঘাতকতায় প্রায় সাড়ে তিনমাস পর তিনি ধরা পড়েন। সেদিন, ১৩ অক্টোবর ১৯৪৩, কাজ শেষে নূর নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে দেখেন সশস্ত্র গেস্টাপো তাঁকে ধরার জন্য ওঁত পেতে রয়েছে। আত্মরক্ষার জন্য তাঁকে একটি পিস্তল দেওয়া হলেও অহিংস-নীতিবাদী নূর কখনই সেটি সাথে রাখতেন না। তাই ধরা পড়ার সময় খালি হাতে একাকী লড়া ছাড়া তাঁর আর কিছুই করার ছিল না। কিন্তু তাই বলে তিনি বিনা যুদ্ধে ধরা দেননি। বরং গ্রেফতারের সময় তাঁর দুর্ধর্ষ আচরণের কারণে জার্মানরা তাঁকে ‘অতি-বিপদজনক বন্দী’ আখ্যা দেয়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, ধরা পড়ার আগে নূর সবশেষ যে ফ্ল্যাটে থাকতেন, সেটি ছিল প্যারিসে গেস্টাপোর সদরদপ্তর থেকে মাত্র দু’শ গজ দূরে!
ধরা পড়ার পর তাঁকে গেস্টাপো সদরদপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর তাঁর ওপর নেমে আসে কঠিন জিজ্ঞাসাবাদের ভয়ংকর খড়্গ। কিন্তু অকথ্য নির্যাতনের জন্য ইতিহাস-কুখ্যাত জার্মান এসএস গেস্টাপো তাঁর কাছ থেকে কোন কথাই বের করতে পারেনি। নির্যাতনের সীমাহীন যন্ত্রণা তিনি মুখ বুঁজে সয়েছেন, তবুও নিজের নাম ‘নোরা বেকার’ ছাড়া আর কোন তথ্য দেননি। পরবর্তীতে যুদ্ধশেষে আত্মসমর্পণকারী ও নূরকে জিজ্ঞাসাবাদকারী জার্মান গোয়েন্দা অফিসারও স্বীকার করেছিল, তারা নূরের কাছ থেকে কিছুই জানতে পারেনি, বরং তিনি একজন সুদক্ষ গুপ্তচরের মত ক্রমাগত ভুল তথ্য দিয়ে তাদের বিভ্রান্ত করেছেন!
প্রায় একমাস নূরকে প্যারিসে বন্দী করে রাখা হয় এবং এর মধ্যেই তিনি দুইবার পালানোর চেষ্টা করেন। যেদিন তাঁকে গ্রেফতার করা হয়, সেদিনই তিনি বাথরুমের জানালা গলে, পানির পাইপ বেয়ে প্রথমবার পালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে ধরা পড়ে যান। তারপর ২৫ নভেম্বর ১৯৪৩ তারিখে তিনি আরও দুইজন বন্দী গুপ্তচর সহকর্মীকে নিয়ে বন্দীশালার ছাদ উঠে পালান। কিন্তু কপাল খারাপ! তখনই বিমান-হামলার সাইরেন বেজে ওঠায় বন্দীশালার প্রহরীরা নিয়মানুযায়ী বন্দীর সংখ্যা গুনতে গিয়ে পালানোর ঘটনা টের পেয়ে যায় এবং বেশি দূর যাওয়ার আগেই নূর আবারও ধরা পড়েন।
সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হল, বন্দী অবস্থায়ও জার্মানরা তাঁকে দিয়ে ইংল্যান্ডে স্বাভাবিক বেতার-বার্তা পাঠানোর অভিনয় চালিয়ে যেতে বাধ্য করে এবং এরকম একটি বার্তায় তিনি তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ধরা পড়ার পূর্ব-নির্ধারিত সংকেত পাঠান। কিন্তু বার্তায় উল্লেখিত তাঁর গ্রেফতার হওয়ার সেই সংকেতটি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে যায়। নূরের ধরা পড়ার বিষয়টি তারা তখনও বুঝতে পারেনি।
নূর বারবার পালানোর চেষ্টা করায়, ‘তিনি আর পালাবেন না’–এই মর্মে তাঁর কাছে থেকে জার্মান গোয়েন্দারা লিখিত মুচলেকা নিতে চাইলে তিনি তা দিতে অস্বীকার করেন। এরপর জার্মানরা তাঁকে আর প্যারিসে রাখা নিরাপদ মনে করেনি। ২৭ নভেম্বর ১৯৪৩ তারিখে তারা তাঁকে প্রথম বন্দী গুপ্তচর হিসেবে কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে জার্মানিতে স্থানান্তর করে একটি কারাগারে রাখে। পরে তাঁকে অন্য একটি দুর্ভেদ্য, নিরাপদ কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। ‘বিপদজনক ও অসহযোগী কয়েদি’ বিবেচনা করে তাঁকে মূল কারাগার থেকে দূরে একটি বিচ্ছিন্ন, নির্জন সেলে রাখা হয় এবং তাঁর হাতে পায়ে লোহার ডাণ্ডাবেড়ি ও কোমরে শিকল পরানো হয়। তিনি তখন এমন এক কয়েদি–বিস্মৃতি ও মৃত্যুই যার একমাত্র পরিণতি।
পরের দশটি মাস কারাগারে অবর্ণনীয়, অমানুষিক, অসহ্য নির্যাতনের এক জীবন কাটান নূর। কিন্তু কোন কিছুই তাঁকে মচকাতে পারেনি। সব কষ্ট, সব যন্ত্রণা তিনি সহ্য করে গেছেন দিনের পর দিন। শেষ পর্যন্ত জার্মানদের কাছে নতি স্বীকার করেননি। বরং এত চেষ্টা করেও তারা কোনদিন তাঁর আসল নামটা পর্যন্ত জানতে পারেনি–অন্যান্য তথ্য তো দূরের কথা।
অবশেষে ১৯৪৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তারিখে নূরকে দাচাউ বন্দীশিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরের দিন ভোরে জার্মানরা আরও তিনজন বন্দিনীসহ তাঁকে ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে হত্যা করে। অসম সাহস, অনন্য কর্তব্যনিষ্ঠা আর সীমাহীন যাতনার এক জীবনের অবসান হয় এভাবেই।
নূরের অবদানের মরণোত্তর স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ব্রিটিশ সরকার ব্রিটেনের সর্বোচ্চ বেসামরিক বীরত্বপদক ‘জর্জ ক্রস’ (George Cross) এবং ফরাসি সরকার ‘ক্রস অব ওয়ার’ (Croix de Guerre)-এ ভূষিত করেছিল। আজও প্রতি বছর ১৪ জুলাই ফ্রান্সের বাস্তিল দিবসে ফরাসি সামরিক বাদক দল প্যারিসের ‘ফজল মঞ্জিলের’ সামনে নূরকে সম্মান জানায়।
মহীশুরের বাঘ, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামে শহীদ, রাজা টিপু সুলতানের বংশধর, ‘প্রিন্সেস’ নূর ইনায়েত খান ব্রিটিশদের পক্ষ হয়ে জার্মান আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল, যুদ্ধশেষে তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে স্বদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়বেন। তা আর হয়নি।
তথ্যসূত্র:
[লেখাটি অন্যান্য ব্লগেও প্রকাশিত]

Monday, March 14, 2011

এক অসাধারণ জীবনকথা যা জেনে রাখা উচিত...


আসসালামু আলাইকুম।
আশাকরি সকলে আল্লাহ্‌র অশেষ কৃপায় সুস্থ থেকে বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত আছেন। আমি আজ একটা লেখা শেয়ার করবো সবার সাথে। এই লেখাটি একটি বক্তব্যের লেখ্যরূপ যে বক্তব্যটি উপস্থাপিত হয়েছিলো বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ছাত্রদের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে। বক্তব্যটি বেশ পুরোনো। তবে আমার জীবনে শোনা সবচাইতে মুগ্ধকর আর উৎসাহমূলক বক্তব্য। তাই সবার সাথে শেয়ার করে নিতে চাইছি। এই বক্তব্য দিয়েছিলেন স্টিভ জবস। যিনি অ্যাপল এবং পিক্সার অ্যানিমেশননামক দুইটি সেরা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইও। বক্তব্য রেখেছিলেন ২০০৫ সালের ১২ জুন। লেখাটির ইংরেজি রূপ স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট থেকে নেয়া।

বক্তার জীবনের মতন এত রকম কঠিন সময়, কষ্টকর সময় আর বৈচিত্র্য আমাদের সবার জীবনে থাকেনা। কিন্তু আমাদের জীবনে থাকে অনেক রকম ঘাত-প্রতিঘাত আর সফলতার আকাঙ্ক্ষা। আর তাই সবারই এই লেখাটা পড়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি, ভালো লাগবে আর অনুপ্রাণিত হবেন সেই নিশ্চয়তা দিচ্ছি  এক অসাধারণ জীবনকথা যা জেনে রাখা উচিত... | Techtunes

“প্রথমেই একটা সত্য কথা বলে নিই”

আমি কখনোই বিশ্ববিদ্যালয় পাস করিনি। তাই সমাবর্তন জিনিসটাতেও আমার কখনো কোনো দিন উপস্থিত হওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। এর চেয়ে বড় সত্য কথা হলো, আজকেই কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠান সবচেয়ে কাছে থেকে দেখছি আমি। তাই বিশ্বের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সমাবর্তন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পেরে নিজেকে অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করছি। কোনো কথার ফুলঝুরি নয় আজ, স্রেফ তিনটা গল্প বলব আমি তোমাদের। এর বাইরে কিছু নয়।

“আমার প্রথম গল্পটি কিছু বিচ্ছিন্ন বিন্দুকে এক সুতায় বেঁধে ফেলার গল্প”

 এক অসাধারণ জীবনকথা যা জেনে রাখা উচিত... | Techtunes
স্টিভ জবস– অ্যাপেল কম্পিউটারের প্রতিষ্ঠাতা
ভর্তি হওয়ার ছয় মাসের মাথাতেই রিড কলেজে পড়ালেখায় ক্ষ্যান্ত দিই আমি। যদিও এর পরও সেখানে আমি প্রায় দেড় বছর ছিলাম, কিন্তু সেটাকে পড়ালেখা নিয়ে থাকা বলে না। আচ্ছা, কেন আমি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়লাম?
এর শুরু আসলে আমার জন্মেরও আগে। আমার আসল মা ছিলেন একজন অবিবাহিত তরুণী। তিনি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। আমার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, আমাকে এমন কারও কাছে দত্তক দেবেন, যাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি আছে। সিদ্ধান্ত হলো এক আইনজীবী ও তাঁর স্ত্রী আমাকে দত্তক নেবেন। কিন্তু একদম শেষ মুহূর্তে দেখা গেল, ওই দম্পতির কারোরই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নেই, বিশেষ করে আইনজীবী ভদ্রলোক কখনো হাইস্কুলের গণ্ডিই পেরোতে পারেননি। আমার মা তো আর কাগজপত্রে সই করতে রাজি হন না। অনেক ঘটনার পর ওই দম্পতি প্রতিজ্ঞা করলেন, তাঁরা আমাকে অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবেন, তখন মায়ের মন একটু গললো। তিনি কাগজে সই করে আমাকে তাঁদের হাতে তুলে দিলেন।
এর ১৭ বছর পরের ঘটনা। তাঁরা আমাকে সত্যি সত্যিই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছিলেন। কিন্তু আমি বোকার মতো বেছে নিয়েছিলাম এমন এক বিশ্ববিদ্যালয়, যার পড়ালেখার খরচ প্রায় তোমাদের এই স্ট্যানফোর্ডের সমান। আমার দরিদ্র মা-বাবার সব জমানো টাকা আমার পড়ালেখার পেছনে চলে যাচ্ছিল। ছয় মাসের মাথাতেই আমি বুঝলাম, এর কোনো মানে হয় না। জীবনে কী করতে চাই, সে ব্যাপারে আমার কোনো ধারণা নেই এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা এ ব্যাপারে কীভাবে সাহায্য করবে, সেটাও বুঝতে পারছিলাম না। অথচ মা-বাবার সারা জীবনের জমানো সব টাকা এই অর্থহীন পড়ালেখার পেছনে আমি ব্যয় করছিলাম। তাই আমি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলাম এবং মনে হলো যে এবার সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।
সিদ্ধান্তটা ভয়াবহ মনে হলেও এখন আমি যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন মনে হয়, এটা আমার জীবনের অন্যতম সেরা সিদ্ধান্ত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি ডিগ্রির জন্য দরকারী কিন্তু আমার অপছন্দের কোর্সগুলো নেওয়া বন্ধ করে দিতে পারলাম, কোনো বাধ্যবাধকতা থাকল না, আমি আমার আগ্রহের বিষয়গুলো খুঁজে নিতে লাগলাম।
পুরো ব্যাপারটিকে কোনোভাবেই রোমান্টিক বলা যাবে না। কারণ তখন আমার কোনো রুম ছিল না, বন্ধুদের রুমের ফ্লোরে ঘুমোতাম। ব্যবহৃত কোকের বোতল ফেরত দিয়ে আমি পাঁচ সেন্ট করে কামাই করতাম, যেটা দিয়ে খাবার কিনতাম। প্রতি রোববার রাতে আমি সাত মাইল হেঁটে হরেকৃষ্ণ মন্দিরে যেতাম শুধু একবেলা ভালো খাবার খাওয়ার জন্য। এটা আমার খুবই ভালো লাগত। এই ভালো লাগাটাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
রিড কলেজে সম্ভবত দেশে সেরা ক্যালিগ্রাফি শেখানো হতো সে সময়। ক্যাম্পাসে সাঁটা পোস্টারসহ সবকিছুই করা হতো চমৎকার হাতের লেখা দিয়ে। আমি যেহেতু আর স্বাভাবিক পড়ালেখার মাঝে ছিলাম না, তাই যে কোনো কোর্সই চাইলে নিতে পারতাম। আমি ক্যালিগ্রাফি কোর্সে ভর্তি হয়ে গেলাম। সেরিফ ও স্যান সেরিফের বিভিন্ন অক্ষরের মধ্যে স্পেস কমানো-বাড়ানো শিখলাম, ভালো টাইপোগ্রাফি কীভাবে করতে হয়, সেটা শিখলাম। ব্যাপারটা ছিল সত্যিই দারুণ সুন্দর, ঐতিহাসিক, বিজ্ঞানের ধরাছোঁয়ার বাইরের একটা আর্ট। আমি এর মধ্যেই মজা খুঁজে পেলাম।
এ ক্যালিগ্রাফি জিনিসটা কোনো দিন বাস্তবজীবনে আমার কাজে আসবে—এটা কখনো ভাবিনি। কিন্তু ১০ বছর পর আমরা যখন আমাদের প্রথম ম্যাকিনটশ কম্পিউটার (আমরা যাকে ম্যাক বলে চিনি) ডিজাইন করি, তখন এর পুরো ব্যাপারটাই আমার কাজে লাগল। ওটাই ছিল প্রথম কম্পিউটার, যেটায় চমৎকার টাইপোগ্রাফির ব্যবহার ছিল। আমি যদি সেই ক্যালিগ্রাফি কোর্সটা না নিতাম, তাহলে ম্যাক কম্পিউটারে কখনো নানা রকম অক্ষর (টাইপফেইস) এবং আনুপাতিক দূরত্বের অক্ষর থাকত না। আর যেহেতু উইন্ডোজ ম্যাকের এই ফন্ট সরাসরি নকল করেছে, তাই বলা যায়, কোনো কম্পিউটারেই এ ধরনের ফন্ট থাকত না। আমি যদি বিশ্ববিদ্যালয় না ছাড়তাম, তাহলে আমি কখনোই ওই ক্যালিগ্রাফি কোর্সে ভর্তি হতাম না এবং কম্পিউটারে হয়তো কখনো এত সুন্দর ফন্ট থাকত না। অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা অবস্থায় এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে এক সুতায় বাঁধা অসম্ভব ছিল, কিন্তু ১০ বছর পর পেছনে তাকালে এটা ছিল খুবই পরিষ্কার একটা বিষয়।
আবার তুমি কখনোই ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোকে এক সুতায় বাঁধতে পারবে না। এটা কেবল পেছনে তাকিয়েই সম্ভব। অতএব, তোমাকে বিশ্বাস করতেই হবে, বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো একসময় ভবিষ্যতে গিয়ে একটা অর্থবহ জিনিসে পরিণত হবেই। তোমার ভাগ্য, জীবন, কর্ম, কিছু না কিছু একটার ওপর তোমাকে বিশ্বাস রাখতেই হবে। এটা কখনোই আমাকে ব্যর্থ করেনি, বরং উল্টোটা করেছে।

“আমার দ্বিতীয় গল্পটি ভালোবাসা আর হারানোর গল্প”

আমি খুব ভাগ্যবান ছিলাম। কারণ, জীবনের শুরুতেই আমি যা করতে ভালোবাসি, তা খুঁজে পেয়েছিলাম।
আমার বয়স যখন ২০, তখন আমি আর ওজ দুজনে মিলে আমাদের বাড়ির গ্যারেজে অ্যাপল কোম্পানি শুরু করেছিলাম। আমরা পরিশ্রম করেছিলাম ফাটাফাটি, তাই তো দুজনের সেই কোম্পানি ১০ বছরের মাথায় চার হাজার কর্মচারীর দুই বিলিয়ন ডলারের কোম্পানিতে পরিণত হয়। আমার বয়স যখন ৩০, তখন আমরা আমাদের সেরা কম্পিউটার ম্যাকিন্টোস বাজারে ছেড়েছি। এর ঠিক এক বছর পরের ঘটনা। আমি অ্যাপল থেকে চাকরিচ্যুত হই। যে কোম্পানির মালিক তুমি নিজে, সেই কোম্পানি থেকে কীভাবে তোমার চাকরি চলে যায়? মজার হলেও আমার ক্ষেত্রে সেটা ঘটেছিল। প্রতিষ্ঠান হিসেবে অ্যাপল যখন বড় হতে লাগল, তখন কোম্পানিটি ভালোভাবে চালানোর জন্য এমন একজনকে নিয়োগ দিলাম, যে আমার সঙ্গে কাজ করবে। এক বছর ঠিকঠাকমতো কাটলেও এর পর থেকে তার সঙ্গে আমার মতের অমিল হতে শুরু করল। প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ তার পক্ষ নিলে আমি অ্যাপল থেকে বহিষ্কৃত হলাম। এবং সেটা ছিল খুব ঢাকঢোল পিটিয়েই। তোমরা বুঝতেই পারছ, ঘটনাটা আমার জন্য কেমন হতাশাজনক ছিল। আমি সারা জীবন যে জিনিসটার পেছনে খেটেছি, সেটাই আর আমার রইল না।
সত্যিই এর পরের কয়েক মাস আমি প্রচন্ড দিশেহারা অবস্থায় ছিলাম। আমি ডেভিড প্যাকার্ড ও বব নয়েসের সঙ্গে দেখা করে পুরো ব্যাপারটার জন্য ক্ষমা চাইলাম। আমাকে তখন সবাই চিনত, তাই এই চাপ আমি আর নিতে পারছিলাম না। মনে হতো, ভ্যালি ছেড়ে পালিয়ে যাই। কিন্তু সেই সঙ্গে আরেকটা জিনিস আমি বুঝতে পারলাম, আমি যা করছিলাম, সেটাই আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। চাকরিচ্যুতির কারণে কাজের প্রতি আমার ভালোবাসা এক বিন্দুও কমেনি। তাই আমি আবার একেবারে গোড়া থেকে শুরু করার সিদ্ধান্ত নিলাম।
প্রথমে মনে না হলেও পরে আবিষ্কার করলাম, অ্যাপল থেকে চাকরিচ্যুতিটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো ঘটনা। আমি অনেকটা নির্ভার হয়ে গেলাম, কোনো চাপ নেই, সফল হওয়ার জন্য বাড়াবাড়ি রকমের কৌশল নিয়ে ভাবার অবকাশ নেই। আমি প্রবেশ করলাম আমার জীবনের সবচেয়ে সৃজনশীল অংশে।
পরবর্তী পাঁচ বছরে নেক্সট ও পিক্সার নামের দুটো কোম্পানি শুরু করি আমি, আর প্রেমে পড়ি এক অসাধারণ মেয়ের, যাকে পরে বিয়ে করি। পিক্সার থেকে আমরা পৃথিবীর প্রথম কম্পিউটার অ্যানিমেশন ছবি টয় স্টোরি তৈরি করি। আর এখন তো পিক্সারকে সবাই চেনে। পৃথিবীর সবচেয়ে সফল অ্যানিমেশন স্টুডিও। এরপর ঘটে কিছু চমকপ্রদ ঘটনা। অ্যাপল নেক্সটকে কিনে নেয় এবং আমি অ্যাপলে ফিরে আসি। আর লরেনের সঙ্গে চলতে থাকে আমার চমত্কার সংসার জীবন।
আমি মোটামুটি নিশ্চিত, এগুলোর কিছুই ঘটত না, যদি না অ্যাপল থেকে আমি চাকরিচ্যুত হতাম।
এটা আমার জন্য খুব বাজে আর তেতো হলেও দরকারি একটা ওষুধ ছিল। কখনো কখনো জীবন তোমাকে ইটপাটকেল মারবে, কিন্তু বিশ্বাস হারিয়ো না। আমি নিশ্চিত, যে জিনিসটা আমাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল সেটা হচ্ছে, আমি যে কাজটি করছিলাম, সেটাকে আমি অনেক ভালোবাসতাম।
তোমাকে অবশ্যই তোমার ভালোবাসার কাজটি খুঁজে পেতে হবে, ঠিক যেভাবে তুমি তোমার ভালোবাসার মানুষটিকে খুঁজে বের করো। তোমার জীবনের একটা বিরাট অংশজুড়ে থাকবে তোমার কাজ, তাই জীবন নিয়ে সত্যিকারের সন্তুষ্ট হওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে এমন কাজ করা, যে কাজ সম্পর্কে তোমার ধারণা, এটা একটা অসাধারণ কাজ। আর কোনো কাজ তখনই অসাধারণ মনে হবে, যখন তুমি তোমার কাজটিকে ভালোবাসবে। যদি এখনো তোমার ভালোবাসার কাজ খুঁজে না পাও, তাহলে খুঁজতে থাকো। অন্য কোথাও স্থায়ী হয়ে যেয়ো না। তোমার মনই তোমাকে বলে দেবে, যখন তুমি তোমার ভালোবাসার কাজটি খুঁজে পাবে। যেকোনো ভালো সম্পর্কের মতোই, তোমার কাজটি যতই তুমি করতে থাকবে, সময় যাবে, ততই ভালো লাগবে। সুতরাং খুঁজতে থাকো, যতক্ষণ না ভালোবাসার কাজটি পাচ্ছ। অন্য কোনোখানে নিজেকে স্থায়ী করে ফেলো না।

“আমার শেষ গল্পটির বিষয় মৃত্যু”

আমার বয়স যখন ১৭ ছিল, তখন আমি একটা উদ্ধৃতি পড়েছিলাম—‘তুমি যদি প্রতিটি দিনকেই তোমার জীবনের শেষ দিন ভাব, তাহলে একদিন তুমি সত্যি সত্যিই সঠিক হবে।’ এ কথাটা আমার মনে গভীরভাবে রেখাপাত করেছিল এবং সেই থেকে গত ৩৩ বছর আমি প্রতিদিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করি—আজ যদি আমার জীবনের শেষ দিন হতো, তাহলে আমি কি যা যা করতে যাচ্ছি, আজ তা-ই করতাম, নাকি অন্য কিছু করতাম? যখনই এ প্রশ্নের উত্তর একসঙ্গে কয়েক দিন ‘না’ হতো, আমি বুঝতাম, আমার কিছু একটা পরিবর্তন করতে হবে।
পৃথিবী ছেড়ে আমাকে একদিন চলে যেতে হবে, এ জিনিসটা মাথায় রাখার ব্যাপারটাই জীবনে আমাকে বড় বড় সব সিদ্ধান্ত নিতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে। কারণ, প্রায় সবকিছুই যেমন, সব অতি প্রত্যাশা, সব গর্ব, সব লাজলজ্জা আর ব্যর্থতার গ্লানি—মৃত্যুর মুখে হঠাৎ করে সব নেই হয়ে যায়, টিকে থাকে শুধু সেটাই, যা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। তোমার কিছু হারানোর আছে—আমার জানা মতে, এ চিন্তা দূর করার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে, সব সময় মনে রাখা যে একদিন তুমি মরে যাবে। তুমি খোলা বইয়ের মতো উন্মুক্ত হয়েই আছ। তাহলে কেন তুমি সেই পথে যাবে না, যে পথে তোমার মন যেতে বলছে তোমাকে?
প্রায় এক বছর আগের এক সকালে আমার ক্যানসার ধরা পড়ে। ডাক্তারদের ভাষ্যমতে, এর থেকে মুক্তির কোনো উপায় নেই আমার। প্রায় নিশ্চিতভাবে অনারোগ্য এই ক্যানসারের কারণে তাঁরা আমার আয়ু বেঁধে দিলেন তিন থেকে ছয় মাস। উপদেশ দিলেন বাসায় ফিরে যেতে। যেটার সোজাসাপটা মানে দাঁড়ায়, বাসায় গিয়ে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও। এমনভাবে জিনিসটাকে ম্যানেজ করো, যাতে পরিবারের সবার জন্য বিষয়টা যথাসম্ভব কম বেদনাদায়ক হয়।
সারা দিন পর সন্ধ্যায় আমার একটা বায়োপসি হলো। তাঁরা আমার গলার ভেতর দিয়ে একটা এন্ডোস্কোপ নামিয়ে দিয়ে পেটের ভেতর দিয়ে গিয়ে টিউমার থেকে সুঁই দিয়ে কিছু কোষ নিয়ে এলেন। আমাকে অজ্ঞান করে রেখেছিলেন, তাই কিছুই দেখিনি। কিন্তু আমার স্ত্রী পরে আমাকে বলেছিল, চিকিৎসকেরা যখন এন্ডোস্কোপি থেকে পাওয়া কোষগুলো মাইক্রোস্কোপের নিচে রেখে পরীক্ষা করা শুরু করলেন, তখন তাঁরা কাঁদতে শুরু করেছিলেন। কারণ, আমার ক্যানসার এখন যে অবস্থায় আছে, তা সার্জারির মাধ্যমে চিকিৎসা সম্ভব। আমার সেই সার্জারি হয়েছিল এবং দেখতেই পাচ্ছ, এখন আমি সুস্থ।
কেউই মরতে চায় না। এমনকি যারা স্বর্গে যেতে চায়, তারাও সেখানে যাওয়ার জন্য তাড়াতাড়ি মরতে চায় না। কিন্তু মৃত্যুই আমাদের গন্তব্য। এখনো পর্যন্ত কেউ এটা থেকে বাঁচতে পারেনি। এমনই তো হওয়ার কথা। কারণ, মৃত্যুই সম্ভবত জীবনের অন্যতম প্রধান আবিষ্কার। এটা জীবনের পরিবর্তনের এজেন্ট। মৃত্যু পুরোনোকে ঝেড়ে ফেলে ‘এসেছে নতুন শিশু’র জন্য জায়গা করে দেয়। এই মুহূর্তে তোমরা হচ্ছ নতুন, কিন্তু খুব বেশি দিন দূরে নয়, যেদিন তোমরা পুরোনো হয়ে যাবে এবং তোমাদের ঝেড়ে ফেলে দেওয়া হবে। আমার অতি নাটুকেপনার জন্য দুঃখিত, কিন্তু এটাই আসল সত্য।
তোমাদের সময় সীমিত। কাজেই কোনো মতবাদের ফাঁদে পড়ে, অর্থাৎ অন্য কারও চিন্তাভাবনার ফাঁদে পড়ে অন্য কারও জীবনযাপন করে নিজের সময় নষ্ট করো না।
যাদের মতবাদে তুমি নিজের জীবন চালাতে চাচ্ছ, তারা কিন্তু অন্যের মতবাদে চলেনি, নিজের মতবাদেই চলেছে। তোমার নিজের ভেতরের কণ্ঠকে অন্যদের শেকলে শৃঙ্খলিত করো না। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, নিজের মন আর ইনটুইশনের মাধ্যমে নিজেকে চালানোর সাহস রাখবে। ওরা যেভাবেই হোক, এরই মধ্যে জেনে ফেলেছে, তুমি আসলে কী হতে চাও। এ ছাড়া আর যা বাকি থাকে, সবই খুব গৌণ ব্যাপার।
আমি যখন তরুণ ছিলাম, তখন দি হোল আর্থ ক্যাটালগ নামের অসাধারণ একটা পত্রিকা প্রকাশিত হতো; যেটা কিনা ছিল আমাদের প্রজন্মের বাইবেল। এটা বের করতেন স্টুয়ার্ড ব্র্যান্ড নামের এক ভদ্রলোক। তিনি তাঁর কবিত্ব দিয়ে পত্রিকাটিকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন।
স্টুয়ার্ট ও তাঁর টিম পত্রিকাটির অনেক সংখ্যা বের করেছিল। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে, আমার বয়স যখন ঠিক তোমাদের বয়সের কাছাকাছি, তখন পত্রিকাটির শেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। বিদায়ী সেই সংখ্যার শেষ পাতায় ছিল একটা ভোরের ছবি। তার নিচে লেখা ছিল— ক্ষুধার্ত থেকো, বোকা থেকো । এটা ছিল তাদের বিদায়কালের বার্তা– “ক্ষুধার্ত থেকো, বোকা থেকো”।
আমি নিজেও সব সময় এটা মেনে চলার চেষ্টা করেছি। আজ তোমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি ছেড়ে আরও বড়, নতুন একটা জীবনে প্রবেশ করতে যাচ্ছ, আমি তোমাদেরও এটা মেনে চলার আহ্বান জানাচ্ছি।
Stay Hungry. Stay Foolish.
ক্ষুধার্ত থেকো, বোকা থেকো
তোমাদের সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

পরিশিষ্টঃ
  • স্টিভ জবসের উইকিপিডিয়া লিঙ্ক
  • এই বক্তব্যটির মূল লিঙ্ক, স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ওয়েবসাইট।
  • লেখাটি প্রথম আলো পত্রিকার এই লিঙ্ক থেকে পড়েছিলাম প্রথমে। পরবর্তীতে আমি মূল লেখা পড়ে কিছু বানান সংশোধন ও ভাষার পরিমার্জন করে সহজপাঠ্য করার চেষ্টা করেছি। ধন্যবাদ অনুবাদক সিমু নাসেরকে। সেই সাথে আমাকেও ধন্যবাদ  এক অসাধারণ জীবনকথা যা জেনে রাখা উচিত... | Techtunes
  • ছবির সংগ্রহঃ উইকিপিডিয়ার এই লিঙ্ক
  • কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ মাহমুদ ফয়সাল

Wednesday, February 23, 2011

গত বছরের ১০টি উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার

অক্সিজেন ছাড়াই বেঁচে থাকে :

777 গত বছরের ১০টি উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার | Techtunes

পৃথিবীতে প্রথম যে এককোষী প্রাণের উদ্ভব ঘটে সেটি অক্সিজেনমুক্ত পরিবেশেই টিকে ছিল দীর্ঘ সময়। মহাজাগতিক রশ্মি থেকে শক্তি সংগ্রহ করে তারা বেঁচে থাকত। এগুলোর মধ্যে ব্যাকটেরিয়াই ছিল প্রধান। প্রায় দেড়শ’ কোটি বছরের প্রক্রিয়ায় অক্সিজেনসম্পন্ন প্রাণীরা আসে। তাদের বিকাশের ফলেই বহুকোষী প্রাণের উদ্ভব ঘটে। ফলে বহুকোষীরা প্রথম থেকেই অক্সিজেনসম্পন্নই ছিল। কিন্তু সম্প্রতি ভূমধ্যসাগরের গভীরে এমন বহুকোষী প্রাণীর সন্ধান জীববিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন, যারা অক্সিজেন ছাড়াই বেঁচে থাকে এবং জন্ম দিতে পারে তাদের পরবর্তী বংশধরদের। ইতালির আনকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল জীববিজ্ঞানী গভীর সমুদ্রে গবেষণা করতে গিয়ে Loricifera পর্বের অন্তর্গত তিনটি (একই পর্বের)  প্রাণীকে খুঁজে পান এ বছর।

লুকজারিয়ান শিংয়ের ড্রাগন :

8989 300x195 গত বছরের ১০টি উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার | Techtunes

 

লুকজারিয়ান শিংয়ের ড্রাগনের কথা নিশ্চয়ই শুনেছেন। আজ থেকে প্রায় ৭ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে এদের পাওয়া যেত বর্তমান আমেরিকার উটা অঞ্চলে। এদের ওজন ছিল ২৫০০ কেজি এবং বিশাল মাথায় ছিল ১৫টি শিং। ২০০৭ সালে উটা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা এই প্রাণীর কঙ্কালের ফসিল আবিষ্কার করেন। আজ থেকে প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে পশ্চিম ক্রিটাশিয়াস জলাভূমির উপকূলে এই প্রাণীগুলোর পদচারণার চিহ্ন পাওয়া গেছে।


তড়িৎ দ্বিমেরুতার মান নির্ণয় :

motor 300x279 গত বছরের ১০টি উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার | Techtunes

 

গেল বছরের প্রথমদিকে বিজ্ঞানের প্রচলিত ধারণায় ঘটেছে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সম্ভব হয়েছে তড়িৎ দ্বিমেরুতার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পর্যায়ে মান নির্ণয়। উল্লেখ্য, ১৮৯৬ সালে জেজে থমসন ইলেকট্রন আবিষ্কার করেন। ইলেকট্রন সম্পর্কে আইনস্টাইন একবার বলেছিলেন, ‘ইলেকট্রনকে ঠিকমতো বোঝা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’ তা এ কাজটির মাধ্যমে এক ধাপ এগিয়ে গেল
ইলেকট্রন প্রবাহে তড়িৎ বা বিদ্যুৎ উৎপন্ন হওয়ার বিষয়টি। ইলেকট্রনের সংজ্ঞায় নতুন করে যোগ হতে যাচ্ছে তড়িৎ দ্বিমেরুতার মাত্রা বা ইলেকট্রিক ডাইপোল মোমেন্ট।


কৃত্রিম জীবনের খোঁজে :

synthetic life 300x169 গত বছরের ১০টি উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার | Techtunes

 

এ বছর সিনথেটিক লাইফের আবিষ্কার পরীক্ষাগারে সম্ভব হয়েছে। ব্যাপারটি আর কিছুই নয়, শুধু ডিএনএ বা আরএনএ ব্যবহার করে জীববিজ্ঞানের সংখ্যাকীকরণ বা ডিজিটালাইজেশন। জিনোমের সিকোয়েন্স করা থেকে যাত্রা শুরু এবং ডিজিটাল কোডকে কম্পিউটারে স্থাপন। তারপর কম্পিউটারের সাহায্যে নতুন জীবনের মালমসলা সাজানো। এভাবে মালমসলা সাজিয়ে সরল জীবনের ভিত্তিও গড়েছেন বিজ্ঞানী ক্রেগ ভেন্টর। রসায়নাগারে কৃত্রিম ভাইরাস তৈরির চেষ্টা সফল হয়েছে অনেক দিন হলো; ২০০৩ সালে প্রথম সিনথেটিক ভাইরাস তৈরি করা হয়েছিল। পোলিও ভাইরাসসহ ১০ হাজার প্রজাতির ভাইরাস তৈরি সম্ভব হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে এর জিনোম পর্যবেক্ষণ করে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সাহায্যে। এক ব্যাকটেরিয়া থেকে অন্য ব্যাকটেরিয়ায় রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়াও সফল হয়েছে। ক্রেগ ভেন্টর মনে করেন, আগামী দু’বছরের মধ্যেই আদিকোষ বা প্রোক্যারিয়ট আর ১০ বছরের মধ্যে প্রকৃত কোষ বা ইউক্যারিয়ট বানানো সম্ভব হবে।

নতুন গ্রহের সন্ধান :

exoplanet গত বছরের ১০টি উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার | Techtunes

 

এ বছর জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানীরা বেশ কিছু নতুন গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন। গ্রহগুলো সৌরজগতের বাইরে। তেমনি একটি গ্রহ হচ্ছে এইচআইপি ১৩০৪৪বি। এটি একটি নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে আবর্তনশীল। বিজ্ঞানীরা জানান, এ রকম নক্ষত্র আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে আরও রয়েছে। সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক হলো ৫৮১ জি গ্গি্নস নক্ষত্রের লাইভেবল বেল্টের সন্ধান। এ বেল্টের বৈশিষ্ট্য হলো এর ভেতরের আবহাওয়া খুব ঠাণ্ডাও নয়, খুব বেশি গরম নয়। অনেকটা পৃথিবীর মতো।


পিরামিডের রহস্য উদ্ধারে রোবট :

pr 300x214 গত বছরের ১০টি উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার | Techtunes

 

সাম্প্রতিক সময়ে বিজ্ঞানের অন্যতম আবিষ্কার হচ্ছে রোবট। প্রায় সবকিছুতেই রোবটের সফল ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা সে চিকিৎসাক্ষেত্রে হোক কিংবা কোনো কিছু উদ্ঘাটন বা উদ্ধারের ব্যাপারে হোক না কেন। সম্প্রতি আবার এ রোবট আলোচিত হচ্ছে সাড়ে ৪ হাজার বছরের পুরনো পিরামিডের রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য। ‘পিরামিড অব খুপু’ নামে পরিচিত বিস্ময়কর এ পিরামিডটি তৈরি হয়েছিল যিশুখ্রিস্টের জন্মেরও ২ হাজার ৫৬০ বছর আগে। সাড়ে ৪ হাজার বছর ধরে কেউই জানে না বা জানতে সক্ষম হয়নি পিরামিডের বন্ধ দরজার পেছনের গুপ্ত কক্ষটিতে কী আছে! মিসরের খুপুর পিরামিডের রানীর কক্ষ থেকে চলে যাওয়া দুটি সুড়ঙ্গপথের ওই দরজা দুটির পেছনের রহস্য উদ্ধারের লক্ষ্যে পুরাতত্ত্ব বিষয়ে মিসরের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান ‘সুপ্রিম কাউন্সিল অব অ্যান্টিকুইটিস’ এবং যুক্তরাজ্যের লিডস ইউনিভার্সিটির একদল বিজ্ঞানী যৌথভাবে একটি রোবট তৈরি করেছে।

হার্শেল টেলিস্কোপে মেঘপুঞ্জের ছবি :

aquila 300x300 গত বছরের ১০টি উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার | Techtunes

 

সম্প্রতি মহাশূন্যে প্রেরিত হয়েছে নতুন আধুনিক মহাকাশ মানমন্দির হার্শেল। এ হার্শেল টেলিস্কোপ অ্যাকুলিয়া নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে ১০০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এ কৃষ্ণকায় মেঘপুঞ্জের ছবিটি পাঠিয়েছে। ছবিটি তোলা হয়েছে হার্শেল টেলিস্কোপের অবলোহিত আলো শনাক্তকরণ অত্যাধুনিক যন্ত্র দিয়ে গভীর মহাশূন্যে প্রায় ১০০টির মতো ভ্রূণ নক্ষত্রের। যে নক্ষত্রগুলোয় ইতিমধ্যে থার্মোনিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া শুরু হয়েছে। ছবিতে আরও প্রায় ৬০০টি নক্ষত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেগুলো সবে নক্ষত্র হিসেবে গড়ে উঠতে শুরু করেছে।


নতুন মৌলের সন্ধান:

mmn 279x300 গত বছরের ১০টি উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার | Techtunes

 

রসায়নবিদরা এ বছর নতুন একটি মৌলের সন্ধান পেয়েছেন। যাকে তারা ১১৭ নম্বর মৌল বলে দাবি করেছেন। এটি একটি ভারী পদার্থ যেটি ক্যালসিয়াম মৌলের আইসোটোপ এবং ভারী পাইয়ের মিশ্রণে বিজ্ঞানীরা প্রস্তুত করেছেন। রাশিয়া তাদের কণাত্বরক যন্ত্রে এ নতুন পদার্থটি তৈরিতে সক্ষম হয়েছেন।

চাঁদমামার গায়ে জল :

water 300x194 গত বছরের ১০টি উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার | Techtunes

 

১৯৬৯ সালের ১৬ জুলাই নিল আর্মস্ট্রং চাঁদে প্রথম পদক্ষেপ ফেলে সূচনা করেছিলেন চন্দ্রজয়ের প্রথম অধ্যায়ের। ২২ অক্টোবর ২০০৮ ভারত রচনা করেছিল দ্বিতীয় অধ্যায়। ভারতের মহাকাশযান চন্দ্রায়ন-১-এর অভিযান থেকে জানা যায় চাঁদের উত্তর মেরুতে বরফপানির অস্তিত্ব। এটিকেই চন্দ্রজয়ের দ্বিতীয় অধ্যায় হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। আগ্নেয়গিরির মুখগুলোয় যে বরফ পানি পাওয়া গেছে ওই মুখগুলোর ব্যাস দুই থেকে পনেরো কিলোমিটার। নাসার বিজ্ঞানীরা জানান, চন্দ্রায়ন-১ -এর তথ্যমতে সেখানে বরফপানির পুরুত্ব হচ্ছে কয়েক কিলোমিটার। হটসনে অবস্থিত লুনার এবং প্লানেটরি ইনস্টিটিউটের ড. পল স্পুডিসের ধারণা, সেখানকার প্রায় ৬০০ মিলিয়ন মেট্রিক টন বরফপানি রয়েছে।

বিড়াল ও কুকুরের তরল খাদ্য গ্রহণে অভিনবত্ব :

 

day 101 cat drinking milk 300x200 গত বছরের ১০টি উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার | Techtunes

 

ম্যাসাচুসেটস প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভার্জিনিয়া প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা বিড়াল ও কুকুরের দুধ ও অন্যান্য তরল খাদ্য গ্রহণের ব্যাপারে একটি চমৎকার তথ্য দিয়েছেন। আমরা যেমন ভেজা রুটি খাওয়ার সময় ঠোঁট সংযত রাখি, তেমনি এ প্রাণী দুটি তরল খাদ্য গ্রহণের সময় তাদের জিহ্বাকে একটি নলার মতো আঁকরে পরিণত করে যেন তারা পাইপ লাগিয়ে তরল নিচ্ছে।

২৯৫০০ কোটি গিগাবাইট তথ্য সংরক্ষিত!

চলছে তথ্যের বিপ্লব। সেই বিপ্লবের বর হচ্ছে ডিজিটাল যুগে মানবসভ্যতার পদার্পণ। এ পর্যন্ত কত তথ্য সংরক্ষিত হয়েছে? একজন মানুষ কী পরিমাণ তথ্য তার স্মৃতিতে ধারণ করতে পারে? এ নিয়ে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার বিজ্ঞানীরা ২০ বছরেরও বেশি গবেষণা করে এর একটা হিসাব দাঁড় করিয়েছেন। কম্পিউটার হার্ডডিস্ক থেকে সেকেলে ফ্লপি ডিস্ক, এক্স-রে থেকে মাইক্রোচিপ, সংবাদপত্র থেকে বই—সব মিলিয়ে ১৯৮৬ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত মোট ২৯৫ এক্সাবাইট তথ্য ধারণ করা হয়েছে। এক্সাবাইট কী? ১০০ কোটি গিগাবাইটে হয় এক এক্সাবাইট। তাহলে ২৯৫ এক্সাবাইট অর্থ?
চীনের মোট আয়তনের যে ক্ষেত্রফল, সেটাকে একটি বই কল্পনা করলে এ রকম ১৩টি বই একটির ওপর আরেকটি সাজালে যা হবে, ২৯৫ এক্সাবাইট মানে ঠিক তা-ই; অথবা তথ্যগুলোকে সিডিতে নিলে ডিস্কের যে পাহাড় হবে তার উচ্চতা পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্বকেও হার মানাবে! আর যে পরিমাণ তথ্য আদান-প্রদান হয়েছে তার পরিমাণ স্বভাবতই আরও অনেক বেশি। গবেষকদের হিসাব বলছে, এটা দুই জেটাবাইটের সমতুল্য। এক জেটাবাইট মানে এক হাজার এক্সাবাইট। সহজ করে বলতে গেলে হিসাবটা হলো, বিশ্বের সব মানুষকে প্রতিদিন ১৭৫টি করে সংবাদপত্র দিলে যা হয় তার সমান।
এই গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০০ সালে সংরক্ষিত তথ্যের ৭৫ শতাংশই ছিল অ্যানালগ আকারে (বই-পত্রিকায়)। কিন্তু ২০০৭ সালের শেষে দেখা গেল, ৯৪ ভাগ তথ্যই ডিজিটালরূপে সংরক্ষিত হয়েছে। তার মানে ডিজিটাল যুগে মানুষের উন্নতি হওয়ার গতি গত দুই দশকে ফি বছর ৫৮ ভাগ করে বেড়েছে। তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর যে তথ্যটি বিজ্ঞানীরা বলছেন তা হলো, গত ২০ বছরে বিশ্বে যে পরিমাণ তথ্য ধারণ করা হয়েছে, একজন মানুষের ডিএনএ (বংশগতির ধারক ও বাহক) তার চেয়ে ৩০০ গুণ বেশি তথ্য সংরক্ষণ করতে পারে!
সূত্রঃ প্রথম আলো

আপনার বয়স কত বছর, কত মাস, কত দিন, কত ঘন্টা, কত মিনিট, কত সেকেন্ড...

সবাই কেমন আছেন নিশ্চই ভাল, আজ আমি আপনাদের সাথে এমন একটি ওয়েব সাইট শেয়ার করব যার মাধ্যমে আপনি খুব সহজে আপনার বয়স জানতে পাবেন , শুধু বয়স না এর মাধ্যমে আপনার বয়স কত বছর, কত মাস, কত দিন, কত ঘন্টা, কত মিনিট, কত সেকেন্ড জানতে পারবেন  এখানে যেয়ে  আপনার জন্ম তারিখ পুরুটা লিখে Calculate বাটানে ক্লিক করুন দেখুন কি মজা…
111111 আপনার বয়স কত বছর, কত মাস, কত দিন, কত ঘন্টা, কত মিনিট, কত সেকেন্ড জানেন তো ???... | Techtunes
বয়স সম্পর্কে আর বিস্তারিত জানতে sainjhf আপনার বয়স কত বছর, কত মাস, কত দিন, কত ঘন্টা, কত মিনিট, কত সেকেন্ড জানেন তো ???... | Techtunes
ধন্যবাদ সবাইকে, সবাই ভাল থাকবেন………………

Wednesday, February 9, 2011

মন ভালো করে দেয়া একটি গল্প

অনেক কাল আগের কথা। একজন দরিদ্র লোক একটি দুর্গম পাহাড়ী এলাকায় পানি বহনের কাজ করত। তার দুইটি পাত্র ছিল, একটি লাঠির দুই প্রান্তে পাত্র দুটি ঝুলিয়ে কাঁধে নিয়ে সে পানি বহন করত। রোজ অনেকটা পথ তাকে হেঁটে পাড়ি দিতে হত।
দুটি পাত্রের একটি কিছুটা ভাঙ্গা, আরেকটি ত্রুটিহীন। পানি নিয়ে যেতে যেতে ভাঙ্গা পাত্রটি প্রায় অর্ধেক খালি হয়ে যেত। অপরদিকে ত্রুটিহীন পাত্রটি প্রতিদিন সুন্দরভাবে কানায় কানায় ভরে পানি পৌছে দিত। এভাবে দরিদ্র লোকটি রোজ তার মনিবের বাড়িতে এক পাত্র আর অর্ধেক অর্থাৎ দেড় পাত্র পানি পৌছে দিত।স্বাভাবিকভাবেই, ভালো পাত্রটি তার এ কাজের জন্য খুব গর্বিত ও আনন্দিত থাকত। অপরদিকে ভাঙ্গা পাত্রটির মন খুব খারাপ থাকত। সে খুব লজ্জিত আর বিমর্ষ থাকত। কেননা তাকে যে কাজের জন্য বানানো হয়েছিল সে তার সেই কাজ পুরোপুরিভাবে করতে পারছিল না।

ত্রুটিপুর্ণ পাত্রটি এভাবে অনেকদিন পানি বহনের কাজ করার পর একদিন আর সইতে না পেরে লোকটির কাছে তার ব্যর্থতার জন্য ক্ষমা চাইলো। সে বলে উঠলো, “আমি আমাকে নিয়ে লজ্জিত ও হতাশ, আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাই”। দরিদ্র লোকটি জানতে চাইলো “কেন তুমি লজ্জা পাচ্ছো” ?
“তুমি কত কষ্ট করে রোজ আমাকে বয়ে নিয়ে যাও, নদী থেকে আমাকে পানি দিয়ে পূর্ণ করে নাও, অথচ আমি তোমার মনিবের কাছে যেতে যেতে অর্ধেক পানি ফেলে দিই, আমার এক পাশে ফাটল, ঐ ফাটল দিয়ে অর্ধেক পানি ঝরে পরে যায়”।
লোকটি তার পাত্রটির প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করলো, বলল, “মন খারাপ করো না। হয়তো এর মাঝেও ভাল কিছু আছে যা তুমি এখন বুঝতে পারছো না”।
ভাঙ্গা পাত্রটি তবু তার অপরাধবোধ আর লজ্জা থেকে মুক্তি পেল না যদিও স্বান্তনার বাণী শুনে কিছুটা শান্তি পেল। মন খারাপ করে সে প্রতিদিনের মতো আজকেও লোকটির কাঁধে চড়ে পানি বয়ে নিয়ে যেতে লাগলো, আর পথ চলতে চলতে ফাটল দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে পানি পরতে লাগলো, কান্নার সাথে মিলে মিশে এক হয়ে ঝরতে লাগলো। পাত্রটি পথে যেতে যেতে আশেপাশে দেখতে লাগলো, সবাই কত ভালো আছে সুখে আছে, কি চমৎকার রৌদ্রজ্জ্বল সকাল, পাহাড়ি পথের পাশে নাম না জানা কত শত ফুল ফুটে রয়েছে। সকালের রোদে, মন ভোলানো কোমল হাওয়ায় তারা হেলছে, দুলছে, খেলছে। “অথচ আমার মাঝে এত কষ্ট কেন” । পাত্রটি ভাবতে ভাবতে রোজকার মত আজও ধনী লোকটির বাড়িতে অর্ধেক পানি পৌছে দিল।
ফিরতি পথে আবারও তার ব্যর্থতার জন্য দরিদ্র লোকটির কাছে সে ক্ষমা চাইলো। তার মন খারাপ দেখে লোকটি একটু থেমে পথের পাশে ফুটে থাকা কিছু পাহাড়ি ফুল ছিঁড়ে এনে দিল তাকে। “দুঃখ করো না। আমি আগে থেকেই তোমার এ ত্রুটির কথা জানতাম, তাই যাবার বেলা প্রতিদিন তোমাকে আমার কাঁধের একই দিকে বয়ে নিয়ে যেতাম। আর যেতে যেতে তুমি তোমার ফাটল দিয়ে পানি ঝরিয়ে ঝরিয়ে যেতে, কখনো কাঁদতেও। এভাবে পথের এক পাশে তুমি প্রতিদিন পানি দিতে, দেখো পথের ঐ দিকে চেয়ে ! কত শত সুন্দর ফুল ফুটে রয়েছে ! তুমিই তো তাদেরকে পানি দিয়েছো,
অথচ পথের অপর পাশে চেয়ে দেখো! ধূলো পাথর ছাড়া কিচ্ছু নেই, কোনো ফুলও ফোটেনি”। (translated )
Moral: “regret over misdeeds erases them, and pride over good deeds ruins them ”~ Hazrat Ali (R)
অনুবাদ কৃতজ্ঞতাঃ সিফাত